লীড নিউজ সৈয়দপুর

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের বদলে যাওয়া দিনের গল্প!

নীলফামারীনিউজ, ডেস্ক রিপোর্ট- সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যখন নভোএয়ারের ফ্লাইট এটিআর ৭২-৫০০ ল্যান্ডিং করলো, তখন চোখে পড়ল ভিন্ন দৃশ্যপট। নির্জন ছোটখাট পরিসরে পড়ে থাকা সেই বিমানবন্দর এটি না। না ভুল করে অন্য কোনো বিমানবন্দরে ল্যান্ড করিনি। সামনে বড় অক্ষরে লেখা ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দর’। একইসঙ্গে নভোএয়ারের অপর একটি ফ্লাইট এবং ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইট যাত্রী নামাচ্ছিলেন। অথচ বছর দশেক আগে যাত্রী সংকটের কারণে সপ্তাহে মাত্র তিনটি ফ্লাইট চলাচল করতো এই বিমানবন্দরে।

আর যদি বছর পনের আগে ফিরে তাকান তখন দেখা যেত সপ্তাহে একটি কিংবা দু’টি ফ্লাইটের রেকর্ড। পনের বছর আগের দিনে একটি ফ্লাইটের যাত্রী মিলতো না, সে কারণে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন ফ্লাইট পরিচালনা করা হতো। তারপর যাত্রী সংকটের মুখে বিমান তাদের অপারেশন বন্ধ করে দেয়। একসময় ইউনাইটেড এয়ার একটি ফ্লাইট চালু করে, সেটি সৈয়দপুর থেকে যাত্রী নিয়ে রাজশাহী ঘুরে ঢাকা যেতো।

আর এখন পনের বছরের ব্যবধানে দিনে ১০টি ফ্লাইট চলাচল করছে ছোট এই বিমানবন্দরটিতে। নভোএয়ারের ৫টি, ইউএস বাংলার ৪টি ও রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমানের ১টি ফ্লাইট। শিগগিরই নভোএয়ার, ইউএস বাংলা এবং বাংলাদেশ বিমান আরও একটি করে ফ্লাইট যোগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৩টিতে।

ফ্লাইট সংখ্যা কিন্তু শুধু শুধু বাড়ানো হয়নি। যাত্রী সংখ্যাও বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। আগে ভাগে বুকিং না দিলে টিকেট পাওয়া দুষ্কর। যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি লাভজনক হওয়ায় নতুন ফ্লাইট যোগ করতে যাচ্ছে সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলাকে টার্গেট করে ১৯৭৯ সালে চালু করা হয় সৈয়দপুর অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর। তখন শুধুমাত্র বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট এই বিমানবন্দর ছেড়ে যেত। ২০০৬ সালে যাত্রী সংকটের কারণে অপারেশন বন্ধ করে দেয় বিমান বাংলাদেশ। আর এখন যাত্রী চাপের কারণে অভ্যন্তরীণ থেকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন।

এই পরিবর্তন শুধুমাত্র আকাশপথে নয়, সড়ক পথও আমূল বদলে গেছে। বছর বিশেক আগে রংপুর বিভাগের মধ্যে শুধু রংপুর থেকে একটি এসি বাস ঢাকায় যাতায়াত করতো। খুব সম্ভবত রংপুরের মালিকানাধীন মোতাহার গ্রুপের ‘আগমনী এক্সপ্রেস’ নামে এই কোচটি চালু করেছিলেন। অনেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়েই চালু হয় এই কোচটি। এরপর আস্তে আস্তে দিনাজপুর, নীলফামারীতে এসিবাস চালু হয়। অনেক পরে কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড়ে এসিবাস চালু হয়। এখনকার চিত্রটা একেবারে ভিন্ন। অনেকগুলো কোম্পানির এসিবাস রংপুরের ৮ জেলায় নিয়মিত যাতায়াত করছে। প্লেনের মতো সাধারণ পরিবহনের আগে এসি কোচের টিকেট শেষ হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে কোম্পানিগুলো নতুন নতুন কোচ যুক্ত করছে।

বিশ বছর আগে ছিলো একটি মাত্র হাইওয়ে, এখন জালের মতো ছড়িয়ে জেলাগুলোকে যুক্ত করেছে। একটি নয় একাধিক মাধ্যমে এক জেলার সঙ্গে অন্য জেলায় যোগাযোগ করা যায়।

এ থেকে এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। প্রকৃত অর্থেই উত্তরাঞ্চল থেকে এখন মঙ্গা নির্বাসিত বলা যায়। আগে যাদের তিনবেলা খাবার জুটত না, তারা এখন সচ্ছল। ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো। আগে গ্রামের পর গ্রাম ছিল মাটির বাড়ি, এখন মাটির ঘর কালে-ভাদ্রে দেখা যায়। বদলে গেছে চেনা গ্রাম। মাটির বাড়ি রূপ নিয়েছে ইটের বাড়িতে। ধীরে ধীরে নগরমুখী হচ্ছে এসব গ্রাম। কার্তিকের মঙ্গাকে নির্বাসিত করতে বোরো (ইরি) ধান দারুণ কাজে দিয়েছে। বাড়তি চালের ফলনে তিনবেলা ভাত খাওয়া মানুষগুলো আগের থেকে অনেক নির্ভার। আগে এই লোকগুলোকে আমনের উপর নির্ভর করতে হতো, যা বেশিরভাগ সময়ে বন্যায় নষ্ট হয়ে যেতো।

দেশের গামেন্টস শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে বেকারত্বের হার কমেছে রংপুরে। এই অঞ্চলে শিল্প না থাকলেও থেমে নেই এসব অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা। ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে মেয়েরা। তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তি মিলেছে এসব পরিবারে। তবে হতাশার বিষয় হলো- একে একে গার্মেন্টস বন্ধ হওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরছে। এই অঞ্চলে শিল্পায়ন জরুরি। না হলে অদূর ভবিষ্যতে সংকট ঘনীভূত হতে পারে। শিল্পায়নের জন্য গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত জরুরি। সঙ্গে প্রয়োজন সরকারের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতা। না হলে রংপুর থেকে মূলধন তুলে ঢাকায় বিমা কোম্পানিগুলোর মতো গগণমুখী টাওয়ার হতেই থাকবে আর পিছিয়ে পড়বে রংপুরের ভাগ্য বদল।