নীলফামারীর জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়… (এক্সক্লুসিভ)

অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম সরকার-সাগর: ‘আমি এমন এক দেশে বাস করি যেখানে বিধবা এবং বউ বলতে গেলে এক এবং একজনকেই বুঝানো হয়। যেখানে জামাকাপড় ব্যবহারের কোন নিয়ম নেই, একমাত্র মেখলা গাউন ছাড়া। যা সামান্য বুকের উপর ছাড়া, যা সামান্য হাটুর নিচে শোভা পায়।’-(Eastern Bengal and Assam District Gazetteers’-Rangpur, 1911.) বেনারসের জনৈক রাজা রঙ্গপুরের কোন এক রাজাকে বৃহত্তর রঙ্গপুর সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে পত্র লেখেন। উক্ত পত্রের জবাবে রঙ্গপুরের রাজা এ অঞ্চল সম্পর্কে উপরোক্ত বর্ণনা দেন।

নীলফামারীর রাজবংশী সম্প্রদায়ের নারীরা উক্ত ধরনের পোষাক পরতেন তাঁর প্রচলন এখনো দেখতে পাওয়া যায়। উক্ত ‘মেখলা’ নামে কাপড়টি এ অঞ্চলে ‘পাতানী বা ফোতানী’ নামেও পরিচিত। নীলফামারীর জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক উৎপত্তি সম্পর্কে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। পূর্বতন নৃতত্ত্ববিদদের অনেক সিদ্ধান্তই বর্তমানে খুব নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হয় না। তবে উপজাতিসমূহের উৎপত্তি নির্ধারণে কোন কোন নৃতত্ত্ববিদ গভীর অনুসন্ধিৎসার পরিচয় দিয়েছেন। নৃতত্ত্ববিদগণের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায় নীলফামারীর অধিকাংশ অধিবাসীই প্রাক-আর্য মঙ্গোলীয় এবং অষ্ট্রিক বা ভেড্ডিড নরগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। কোন কোন নৃতত্ত্ববিদ এদের একাংশকে দ্রাবিড় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করলেও দ্রাবিড় নামে কোন নরগোষ্ঠীর স্বীকৃতি নেই। এ গোষ্ঠীর পরপরই নীলফামারী জেলায় স্থান দেয়া হয় ইন্দো-আর্য গোষ্ঠীভুক্ত জনগোষ্ঠীকে।

নীলফামারীর কিছুসংখ্যক লোকের গৌর বর্ণ, উন্নত নাসা, প্রশস্ত ললাট, ঋজু ও কোমল চুল এবং মাথার খুলির গঠন পর্যবেক্ষণ করে তাদেরকে আর্যদের উত্তর-পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর তুর্কী ও ইরানীদের মিশ্রণও ঘটে। সে কারণে নীলফামারীতে কোন বিশুদ্ধ রক্তের নরগোষ্ঠী নেই। ফলে নীলফামারীর বর্তমান অধিবাসীদেরকে সঙ্কর জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। নীলফামারী জেলার অধিবাসীদের প্রধান অংশই মুসলমান। এখানকার অপরাপর ধর্ম-ভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিন্দু, খ্রিষ্টান উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এখানে কিছুসংখ্যক সাঁওতাল, কোচ, রাজবংশি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে। এদেরকে আদিবাসী বা অন্যান্য সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

নীলফামারীর বৈচিত্র্যপূর্ণ জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। নীলফামারী জেলা ভৌগোলিকভাবে প্রাচীনকালে কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। এজন্য কামরূপ ও আসামের নৃগোষ্ঠীর সাথে নীলফামারীর নৃগোষ্ঠীর সাদৃশ্য দেখা যায়। নীলফামারীর নৃগোষ্ঠীর আচার আচরণ, দেহসৌষ্ঠব ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বহু নৃগোষ্ঠীর প্রভাব লক্ষ্য করা গেলেও মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর প্রাধান্য বিদ্যমান। এছাড়াও এ অঞ্চলে নিগ্রবটু ও আদিম যাযাবর জাতির প্রাধান্য দেখা যায়। নীলফামারীতে অষ্ট্রিকদের আগমনের পর স্থানীয় অধিবাসীরা অষ্ট্রিকদের সভ্যতার সাথে মিশে যায়। অষ্ট্রিকরা কৃষি কাজ জানত। ফলে তারাই প্রথম করতোয়া অববাহিকায় কৃষি কাজ শুরু করে। অষ্ট্রিকরা খর্বদেহী, বিস্তৃত নাক ও দীর্ঘ শিরের অধিকারী ছিলেন। পরবর্তীতে এ অঞ্চলে দ্রাবিড়দের আগমন ঘটে। অষ্ট্রিকরা কৃষিকাজ জানলেও নগর-সভ্যতা সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল না। দ্রাবিরদের সংমিশ্রণে অষ্ট্রিকরা নগর সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এদের দৈহিক গঠন মাঝারি, কম বিস্তৃত নাক ও দীর্ঘ শিরঙ্ক ছিলো। সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, কোল বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে এদের অনেক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, এ অঞ্চলে ডিমসা, রাভা, বোদা, মোরঙ্গ প্রভৃতি নামে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করতো। ডিমসা জাতির বসবাস থেকে ডিমলা নামকরণ হয়েছে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কোচ, মেচ, কৈবর্ত, রাজবংশীসহ আরো অনেক নৃগোষ্ঠীর লোক এ অঞ্চলে বসবাস করতেন। ১৮০৭-১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন বলেছেন যে নৃকুলবিদ্যার ((ethnology) বিচারে কোচ, পলিয়া এবং রাজবংশীরা একই জাতির মানুষ। তিনি বলেন-

I have no doubt, however, that all the Koch are sprung from the same stock, and the most of the Rajbangsi’s are Koch; but I am inclined to think, that many of the former (Koch etc) their impure practices, have been admitted to a communication. In fact there is reason to suppose, that until very lately, the different tribes of Kamrup permitted intermarriage

নীলফামারী জেলার হাজার বছরের ইতিহাসের সাথে এখানকার সকল অধিবাসী একাকার হয়ে আছে। সঙ্গত কারণেই নীলফামারীর জনবসতি, জনসংখ্যা, জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়, বর্ণভিত্তিক জনসমাজ, আদিবাসী যথা- কৈবর্ত, সাঁওতাল, রাজবংশী প্রভৃতিদের সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ রয়েছে। এ অঞ্চলে যোগী, নাথ, কৈবর্ত, শুদ্র, রাজবংশী সম্প্রদায় বসবাস করতো।

এছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধরাও এ এলাকায় দীর্ঘকাল যাবত বসবাস ও রাজত্ব করেন। হিন্দু এখনো থাকলেও পুরাকালের কিছু বৌদ্ধমঠ ছাড়া বর্তমানে বৌদ্ধদের অস্তিত্ব আর নেই। বর্তমানে নীলফামারী জেলার প্রধান জনগোষ্ঠী হল মুসলমান। তাদের পরই হিন্দুদের স্থান। এ ছাড়া খ্রিষ্টান, আদিবাসী বা অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কিছুসংখ্যক লোক নীলফামারী জেলায় বসবাস করেন। J. A. Vas প্রণিত Eastern Bengal and Assam District Gazetteers’-Rangpur-এর বিবরণ অনুযায়ী অতীতে এ অঞ্চলে বিভিন্ন নি¤œবর্ণ শ্রেণির লোকের বাস ছিল। বর্ণভেদ অনুসারে শুদ্রদের চেয়ে নি¤œশ্রেণি ভুক্ত হল ‘শুড়ি’ বা সাহা সম্প্রদায়। যাদের আদিপেশা ছিল উত্তেজক মাদকদ্রব্য তৈরী। পরবর্তীকালে এরা ব্যবসায়ী, ভূমির মালিক, সুত্রধর কিংবা ‘বৈরাগী’ ও ‘যোগী’ পেশা গ্রহণ করে। যুগীরা জীবিকার জন্য কৃষিকর্ম, চুন প্রস্তুতের কাজ ও বৈরাগীরা সন্ন্যাস জীবন অবলম্বন করত। এদের চেয়েও ‘চাষী-কৈবর্ত’, ‘নম শুদ্র’ বা ‘চাল’, ‘পাটনী’, ‘মালো’, ‘তিয়ার’, ‘কোচ’ ও ‘দোয়ই’ প্রভৃতিকে নিম্ন বর্ণের লোক বলে মনে করা হত।

এদের মধ্যে রাজবংশীরা বিচিত্র পেশায় নিয়োজিত। তারা কামার, সূতার, গোয়ালা ও গৃহস্থালী কাজে যথেষ্ট পারদর্শী। জে. এ. ভাসের বিবরণ থেকে আরো জানা যায় নীলফামারীর ‘কোচ’ এবং ‘দোয়াই’-দের প্রধান পেশা ছিল পাল্কী পরিবহণ। এরা অনেকেই চাষের কাজও করত। ‘দোয়াই’দেরকে বর্ণসঙ্কর ‘গারো’ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে মনে করা হয়ে থাকে। হিন্দু সমাজের সর্ব নিম্নস্তরে মুচি, চামার, ডোম, ভু’ইমালী ও হাড়িদের অবস্থান।

নীলফামারী জেলায় পূর্বে যে সকল ক্ষুদ্র নৃসম্প্রদায় বসবাস করতেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনজাতি হচ্ছে কোচ। নীলফামারী হচ্ছে একটি বৈচিত্রপূর্ণ সাংস্কৃতিক সমন্বয় ভূমি। বিভিন্ন নরগোষ্ঠী, বহু বিচিত্র জনধারা নীলফামারীতে এসে একদেহে বিলীন হয়েছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে কোচজাতি সুপ্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ এবং অন্যতম ব্রিটিশ প্রশাসক ও গবেষক কর্ণেল ডাল্টন কোচদেরকে বাংলার অন্যতম প্রাচীন অধিবাসী হিসেবে অখ্যায়িত করেছেন। এদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য সম্বলিত কোন প্রামাণ্য গ্রন্থের সন্ধান আমাদের কাছে নেই।

‘কেহ নামি জানে কার আহবানে
কত মানুষের ধারা দুর্বার স্রোতে এলো কোথা হতে
সমুদ্রে হলো হারা।
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য
হেথায় দ্রাবিড়, চীন-
শক-হুন-দল পাঠান মোগল
একদেহে হল লীন’।

নোবেল বিজয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারততীর্থ কবিতায় উল্লেখিত লাইনগুলোতে যা বলা হয়েছে তা অবিভক্ত ভারতবর্ষের সকল কোচ জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সমভাবে প্রযোজ্য বটে। আলোচ্য নীলফামারী জেলাও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। ইতিহাস দৃষ্টে দেখা যায় কোচ সম্প্রদায় সুদীর্ঘকাল ধরে বংশ পরম্পরায় পাক-ভারত উপমহাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে রাজত্ব ও বসবাস করেছেন। নীলফামারী জেলার যেখানে যত প্রাচীন কীর্তিচিহ্ন বিদ্যমান, লোকশ্রুতি অনুযায়ী এসবের সাথে কোচদের স্মৃতি বিজড়িত। কোচদের নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রাজবংশীদের সাথে এদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবু গেইট মনে করেনঃ

There seems however to be no doubt that the true koches were a Mongoloid race very closely allied to meches and Garos; and we find that in Jalpaigury, Kochbihar and Goalpara the persons now known as Rajbansi are either pure koches, who thought dark have a distinctly mongoloid physiognomy or else a mixed breed, in which the Mongoloid elements predominate’.

কোচ রাজবংশীদের নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কে অনেক ক্লাসিকাল ও আধুনিক পন্ডিত জড়িয়ে পড়েছেন। বুকানন হ্যামিলটন, কর্ণেল ডাল্টন, স্ক্যাম্পবেল, উইলিয়াম হান্টার, রৌরি রিজলে ওল্ডহ্যাম, গেইট, বেভারলি এবং নীহারঞ্জন রায় প্রমুখ পন্ডিতবর্গের বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। কোচ ও রাজবংশীদের একই নৃগোষ্ঠী হিসেবে দেখেছেন ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় সকল লেখক ও নৃবিজ্ঞানী। ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলল্টন মন্তব্য করেন; নৃকুলবিদ্যার বিচারে কোচ পালিয়া ও রাজবংশীরা একই জাতের মানুষ। জে. এ. ভাস এর মতে, বৃহত্তর রংপুর জেলা তথা নীলফামারীর রাজবংশীরা প্রধানত কোচ সম্প্রদায়ের মঙ্গোলীয়ান টাইপের অন্তর্ভুক্ত।

ঊইলিয়াম হান্টারও বলেছেন, কোচ পালিয়া রাজবংশী একই নরগোষ্ঠী থেকে এসেছে। হাবার্ট হোপ রিজলে রাজবংশীদের মূলত কোচ সম্প্রদায়ভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাদেরকে দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত মঙ্গোলীয় মিশ্রণে অবিমিশ্র বলে উল্লেখ করেছেন। উপর্যুক্ত সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারীতে রাজবংশীদের কোচ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের গণনা কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দেন যে, রাজবংশীরা কোচদের সমতুল্য বিধায়, তাদের হিসাব কোচ সম্প্রদায়ের সাথে একীভূত করা হবে। রাজবংশীরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে নি। ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে রাজবংশীরা পৃথক নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

পরবর্তীকালে, কোচ রাজবংশী যে একই নৃতাত্ত্বিক সত্তা নয় এ বিষয়ে বহু প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন নৃবিজ্ঞানের গবেষকগণ। তারা মনে করেন যে, গাঙ্গেয় উপত্যকা তথা পশ্চিম ও দক্ষিণে রাজবংশীরা দ্রাবিড়ভাষী ইন্দো-ভূমধ্যসাগরীয় নরগোষ্ঠীভূক্ত এবং উত্তর ও পূর্বের কোচরা মঙ্গোলীয় নরগোষ্ঠীভূক্ত।

লেখক- আইনজীবী, জেলা ও দায়রা আদালত, নীলফামারী। দুরাভাষঃ ০১৭১২২৮৪৫৭২, ই-মেইলঃ advsagar29@gmail.com

Comments

comments

‘এই গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোন সংবাদ বা তথ্য কপি/পেষ্ট করে প্রকাশ করা কপিরাইট আইনে অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।’