বিলুপ্তির পথে সুগন্ধি ধান:নীলফামারীতে এখন শোনা যায় না ‘ও বন্ধু আইসেন হামার বাড়ী, বাইসেরা ধানের ভাত খোয়ামো..’

মো. মহিবুল্লাহ্ আকাশ-নীলফামারী হামার নীলে ভরা রে, আরে ও বন্ধু আইসেন হামার বাড়ী। বাইসেরা ধানের ভাত খোয়ামো, থাকেন দিনাচারি, আরে বৈদেশী বন্ধুরে, আইসেন হামার বাড়ি। মন জুড়ানো এমন ভাওয়াইগান গান কিংবা ‘হামার বাড়ি আইসেন বন্ধু বসির দিমো পিড়া, জলপান করির দেমো শালি ধানের চিড়া, শালি ধানের চিড়ারে বন্ধু বিন্নি ধানের খই, বাড়ির গাছের সবরি কলা গামছা বান্ধা দই ”- প্রাণ জুড়ানো এমন কাগজ কলমের লোক ছড়ায় ধান বন্দনা এখনও অতীতে নিয়ে যায় আমাদের। এসব চালের তৈরি সুুস্বাদু পিঠা-পায়েস, খই-মুড়ি ও ভাতের গন্ধ এবং স্বাদ ছিলো অসাধারণ।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় নানা জাতের ধান চাষ হয়ে আসছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এ দেশে ১৫ হাজার জাতের ধান আবাদ হতো। ঐতিহ্যবাহী রাজভোগ, দুধরাজ, পঙ্খিরাজ এসব ধানের আলাদা-আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিলো। রাজভোগ ধানের চাল চিকন, বেশ লম্বা এবং ভাত ধবধবে সাদা। আবার দুধরাজ ধানের চাল ব্যবহার হতো পিঠা-পায়েস তৈরিতে। পঙ্খিরাজ ধানের চাল খৈ, মুড়ি, চিড়া তৈরির জন্য ব্যবহার হতো।

নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি জাতের ধান ছিল ‘রাজভোগ’। মসজিদে মসজিদে মিলাদ ও ঘরে ঘরে লক্ষ্মীনারায়ণ পূজার মাধ্যমে নবান্নের উৎসবের সূচনায় রাজভোগের চাল ব্যবহার হতো। স্বাদ ও গন্ধে অতুলনীয় এ চাল খেতেও সুস্বাদু। কথিত আছে, এই উন্নত ধানের চাল দিয়ে রাজাকে ভোগ দেয়া হতো বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘রাজভোগ’। উপঢৌকন হীরা, পান্না, স্বর্ণ মুদ্রা পেয়ে তৎকালীন রাজারা যত না খুশি হতেন, তার চেয়ে বেশি খুশি হতেন রাজভোগ চাল পেয়ে।

কিন্তু দিনে দিনে স্থানীয় সুগন্ধি জাতের ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন নীলফামারীর কৃষকরা। ফলে জেলার ঐতিহ্যবাহী রাজভোগ, কাটারিভোগসহ সুগন্ধি চালের অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। সুগন্ধি উফশী জাতের অন্যান্য ধানের চাষ বাড়লেও তাতে পাওয়া যাচ্ছে না ঐতিহ্যবাহী স্বাদ আর সুগন্ধ।

হাইব্রিড ধানের চাষাবাদ, রাসায়নিক সার ব্যবহার, গুণগত মানসম্পন্ন বীজের অপ্রতুলতা, উৎপাদন খরচসহ নানা প্রতিকূলতায় এসব ধানের আবাদ ক্রমেই কমছে। এ জনপদের কৃষকরা এখন সুগন্ধি ধান চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ ও নিরাশায় ভুগছেন। এ কারণে গুণে-মানে, স্বাদে-গন্ধে ভরা এই ধানচাষে আগের মতো আর উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায় না তাদের মধ্যে।

সদর উপজেলার সংগলশী, সোনারায়, চড়াইখোলা, চওরাবড়গাছা, খোকশাবাড়ি, গোড়গ্রাম, রামনগর, টুপামারী, কুন্দুপুকুর, ইটাখোলা সহ সৈয়দপুরের কামারপুকুর, কাশিরাম বেলপুকুর, বোতলাগাড়ি, বাঙ্গালীপুর, ডোমারের পাঙ্গামটুকপুর, বোড়াপাড়ি, বামুনিয়া, গোমনাতি, ভোগডাবুড়ি, ডিমলার, খালিশা চাপানী, খগাখড়িবাড়ি, জলঢাকার মীরগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের মাগুড়া ও বড়ভিটা ইউনিয়নের কিছু স্থানে এসব সুগন্ধি জাতের ধান চাষাবাদ হতো সবচেয়ে বেশি।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সুগন্ধি দেশী জাতের ধানের চাষ কমে গেলেও নীলফামারীতে এখন উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাতের ব্রি-৩৪ ধানটি প্রচুর আবাদ হচ্ছে। এই জাতের ধান প্রতি একরে ২৪-২৭ মণ পর্যন্ত উৎপন্ন হয়। দাম বেশী পাওয়ায় এ জাতের ধানটিই বেশী আবাদ করছেন কৃষকরা। এ চালের পোলাও ছাড়া বিরিয়ানি, জর্দ্দা, পায়েশ ও ফিরনি বেশ চমৎকার ও সুস্বাদু- যা জিভে জল আনে।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক (পিপি) কেরামত আলী নীলফামারীনিউজকে জানান, নীলফামারীতে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধানচাষ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-৩৪ জাতের ধানটিই বেশী। সদর উপজেলার মধ্যে সংগলশী ইউনিয়নে এ জাতটি প্রচুর আবাদ হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে জিরা কাটারি, বাদশাভোগ ৮৫০, কালোজিরা, চিনিগুড়া ইত্যাদি।

নীলফামারী সদর উপজেলার সংগলশী ইউনিয়নের কৃষক মতলুবর রহমান নীলফামারীনিউজকে জানান, ব্রি-৩৪ তথা সুগন্ধি ধান চাষে সুগন্ধির পাশাপাশি উৎপাদিত চালের পরিমাণ অন্য জাতের তুলনায় ভাল পাওয়া যায়।

তবে সুগন্ধি অন্য জাতের ধান চাষে খরচ একটু বেশী জানিয়ে তিনি বলেন, সুগন্ধি ধানচাষের জন্য একমাত্র গোবর সারের প্রয়োজন। বর্তমানে গোবর সার কিনতেও পয়সা লাগে। তাছাড়া এই ধান উৎপাদনে পরিশ্রম ও অধিক যত্নেরও প্রয়োজন হয়। সে অনুপাতে ফলন খারাপ হলে এই ধানচাষ করতে গিয়ে কৃষকদের লোকসানও গুণতে হয়। এ কারণে অনেক কৃষক সুগন্ধি ধান চাষ করতে চান না।

সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুরের কৃষক ফজলুল হক বজু নীলফামারীনিউজকে জানান, সুগন্ধি ধান চাষে আগ্রহ হারানোর আরও একটি কারণ হলো, গুণগতমানের বীজের সংকট। দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের ঘরে তৈরি করা বীজ প্রক্রিয়ার জন্য আগের মত সুগন্ধি জাতের ধানচাষে আশানুরূপ উৎপাদন হয় না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বীজ সংগ্রহ করা হলে সুগন্ধি জাতের ধানচাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়বে।

তিনি আরো বলেন, স্থানীয় জাতের সুগন্ধি ধানের আবাদ কমলেও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাতের ফলন বেশি হওয়ার কারণে এই জাতের ধান চাষে কৃষকরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তাই উফশী জাতের সুগন্ধি ধানের বীজ সরকারি ভাবে কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা হলে ভাতের সুঘ্রাণে আবারো প্রাণ জুড়ানো যাবে বলে মত দিয়েছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে রিপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিউজরুম এডিটর আসাদুজ্জামান সুজন ও ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি বাদশাহ্ শাহজাহান।

‘এই গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোন সংবাদ বা তথ্য কপি/পেষ্ট করে প্রকাশ করা কপিরাইট আইনে অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।’