বিবার্তা সম্মাননা পাচ্ছেন জলঢাকার কৃতী সন্তান তুরিন আফরোজ

নীলফামারীনিউজ, ডেস্ক রিপোর্ট- একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় যে শিশুটির জন্ম, স্বাধীনতার লাল-সবুজে যে শিশুটির জন্মকাল নিবন্ধিত, গণহত্যা, সেই শিশুটি ব্রত নিয়েছিল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন আপসহীন লড়াই করার।

সেই শিশুটিই আজকের স্বনামধন্য ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তার জন্ম ১৯৭১ সালের ৪ আগস্ট; ঢাকায়। বাবা তসলিম উদ্দিন আহমেদ নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বাসিন্দা। মা সামসুন্নাহার দিনাজপুর শহরের মেয়ে।

যুদ্ধাপরাধবিরোধী অকুতোভয় এই সৈনিককে সম্মাননা জানাবে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিবার্তা২৪ডটনেট।

.
আগামী ৬ মার্চ বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এই গুণীজনকে বিবার্তা স্বর্ণপদক দেয়া হবে। এবারো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মোটি আটটি ক্যাটাগরিতে আটজনকে সম্মাননা দেবে বিবার্তা।

তুরিনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু পুরানো ঢাকার লিটল জুয়েলস স্কুলে। এরপর ১৯৭৮ সালে ভর্তি হন হলিক্রস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। পড়ালেখায় মেধাবী তুরিন একই সাথে গান, ছবি আঁকা, অভিনয়, আবৃত্তি, বিতর্কে সমান পারদর্শী। অসংখ্য দেশী-বিদেশী পুরস্কার রয়েছে তাঁর ঝুড়িতে।

১৯৮৮ সালে ঢাকা বোর্ডের মানবিক শাখায় মেধা তালিকায় তুরিন আফরোজ প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেডী শ্রীরাম কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স এবং পরবর্তীতে দিল্লি স্কুল অব ইকনোমিক্স থেকে অর্থনীতিতে এম.এ. পাস করেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন বেশ কয়েকবার। ১৯৯২ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের “বেস্ট অল রাউন্ড স্টুডেন্ট” হিসেবে জিতে নেন “কমলা নেহেরু পদক”। এর আগে কোনো বিদেশী শিক্ষার্থী এ পদক পাননি।

অর্থনীতিতে এম.এ. করার পর তুরিন আফরোজ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল.এল.বি. পাস করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি আইন পেশার সনদ লাভ করেন। বেশ কয়েক বছর আইন প্র্যাকটিস করার পর তুরিন অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনি থেকে ডিস্টিংশান সহকারে মাস্টার অব ল’ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর ২০০০ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে “ব্যারিস্টার অ্যান্ড সলিসিটর” ডিগ্রী লাভ করে নিউ সাউথ ওয়েলস সুপ্রীম কোর্টে মামলা পরিচালনা করার যোগ্যতা অর্জন করেন।

তুরিন ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটিতে এক বছর এবং মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে চার বছর আইনের শিক্ষকতাও করেন।

তুরিন আফরোজ ২০০২ সালে আইন এবং অর্থনীতি বিষয়ক যৌথ গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য “David J. Teece AUSTLEA Scholar in Law and Economics” পদকে ভুষিত হন।

২০০৬ সালে তুরিন আফরোজ বাংলাদেশে ফিরে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে যোগদান করেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ নিয়ে আয়োজন করতে থাকেন একের পর এক অনুষ্ঠান – বিতর্ক প্রতিযোগিতা, তারুণ্য সম্মেলন, ছায়া সংসদ, তরুণ মুক্তিসেনা ক্যাম্প। সবকিছুই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রতিষ্ঠার লড়াই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আর্থিক সহায়তায় এ সময় তিনি গড়ে তোলেন এক নতুন আন্দোলন – “আবার ৭১”। ২০১২ সাল পর্যন্ত ৬৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও সমপর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তুরিন আফরোজ কাজ শুরু করেন ২০১০ সালে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে, আবার কখনও দেশ ছাড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকায়।

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রসিকিউশন টিমে অল্প সময়ে তুরিন তার কর্মদক্ষতা দিয়ে নতুন গতি সংযোজিত করেন।

তবে তুরিনের জীবনটা এখন আর আগের মতো নেই। খুনীরা তাকে ও তার সন্তানকে আক্রমণ করেছে বার বার। কিন্তু কিছুতেই তুরিনের কাজকে বন্ধ করতে পারেনি।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায়ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তুরিন। যখন যেখানেই সাম্প্রদায়িক শকুনেরা নখ বসিয়েছে, তুরিন ছুটে গেছেন সেখানে, প্রশাসনকে প্রশ্ন করেছেন এবং নির্যাতিতদের দিয়েছেন আশ্বাস ও সাহস।

নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তুরিন অর্জন করেছেন ‘TOYP (Ten Outstanding Young Persons) ২০১৩ পুরস্কার’, ‘শীর্ষ দশ অনন্যা পুরস্কার-২০১৫’, ‘সূর্যবার্তা মিডিয়া পুরস্কার-২০১৬’ সহ আরো অনেক সম্মাননা।

তুরিন বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন।৮ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান তেজস্বী তুরিন(সুমেধা) তার সকল প্রেরণার উৎস।

‘এই গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোন সংবাদ বা তথ্য কপি/পেষ্ট করে প্রকাশ করা কপিরাইট আইনে অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।’