নাগরিক কথা আমরা নাহয় উত্তরবঙ্গের মফিজ, কিন্তু আপনি?

নীলফামারীনিউজ, ডেস্ক রিপোর্ট- ২০১৩ সালে প্রথমবার ঢাকা আসি এডমিশন কোচিং এর জন্য। যখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হত আমার দেশের বাড়ী কোথায়, আমার উত্তর পেয়ে তাদের অনেক কেই বলতে দেখেছি, “উত্তরবঙ্গ! মফিজ এলাকার লোক।” আমি প্রচন্ড কষ্ট পেতাম। কষ্টটা “মফিজ” বলার জন্য নয়, কষ্টটা হত “মফিজ” বলার সময় তাদের মুখে বঞ্চনার রেশ দেখে! আমি কষ্ট পেতাম, অপমানিত বোধ করতাম, আমার রাগ হত, রাগে মুখে থুথু জমা হত। কিন্তু কিছু বলতাম না। কারণ তারা দেশের এলিট সমাজের সদস্য। এখনও অনেকে “উত্তরবঙ্গ” শুনলে ঠাট্টা করেন। আমি এখনো কিছু বলি না। বলার সাহস নেই তা না, আসলে বলার ইচ্ছা থাকে না। তাদের মুখের দিকে তাকাতে ঘেন্না লাগে তখন! অপমান গায়ে মাখি না, আমি খুব গর্ব করে বলি, “আমি খাঁটি উত্তরবঙ্গের মানুষ, আমি গর্বিত আমার জন্ম উত্তরবঙ্গে হয়েছে।”

সমাজের সেই এলিট সদস্যদের উদ্দেশ্য করে কিছু জানাতে চাই। তার আগে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে নেই। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি বা ডিসকভারি-এর মত চ্যানেলগুলোতে সবথেকে জনপ্রিয় প্রোগ্রাম কোনগুলো জানেন? Survival বিষয়ক প্রোগ্রামগুলো। ইংরেজীতে একটা কথা আছে, “Survival of the fittest.” এর সারমর্ম হচ্ছে, টিকে থাকা সম্মানের, বঞ্চনার নয়।

যাইহোক, মূল কথায় ফিরে আসি। মফিজ শব্দটা এলিট সমাজ ব্যবহার করে গালি হিসেবে। আমার সন্দেহ হয় তারা আদৌ এর অর্থ জানেন না, নাকি জেনেও নিজেদের এলিটগিরি রাখতে এটা নিয়ে টিটকারি করেন?

মফিজ শব্দটা এসেছে দু’টো জায়গা থেকে। “মপীজ” (মঙ্গা পীড়িত জনগণ) থেকে বিকৃত হয়ে মফিজ। আর দ্বিতীয়টা বলতে গেলে একটা গল্প বলতে হবে।

আজ থকে প্রায় ৪০ বছর আগে রংপুরের রৌমাড়ি, চিলমারী, নাগেস্বরী, ভুরুঙ্গামারী, উলিপুর সহ বেশ কিছু এলাকায় খুব বড় আকারের বন্যা হয়েছিলো। সেই ভয়াবহ বন্যায় অধিকাংশ মানুষের বাড়ি-ঘর, জমি-জমা এমনকি সর্বশেষ সম্বলটুকুও ব্রক্ষপুত্র নদীতে হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছিলো। এক পর্যায়ে সেখানকার মানুষ জীবন বাঁচানোর তাগিদে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসতে শুরু করে।

এজন্য তারা রংপুরের মর্ডান বাসস্ট্যান্ডে এসে উপস্থিত হয়। সে সময়ে যানবাহন কম ছিলো, কিন্তু দালাল ছিলো বেশি। বাসের দালালকে তো সবাই চেনেন। দালালরা যত বেশি যাত্রী বাসে উঠিয়ে দিতে পারবে ততো বেশী তাদের কমিশন। সেই সময়ে মডার্নে একজন দালালের নাম ছিলো মফিজ উদ্দিন, যাকে সবাই মফিজ বলে ডাকতো। বন্যাকবলিত লোকদেরকে দেখে মফিজ মিয়া তাদের জিজ্ঞাস করলো, আপনারা সবাই কোথায় যাবেন? উত্তরে সেই মানুষগুলো তাদের ঢাকা যেতে চাওয়ার কারণ ও দুঃখ-কষ্টের কথাগুলো মফিজ মিয়াকে বুঝিয়ে বললো।

তখন ঢাকা যাবার ভাড়া ছিলো ১০০ টাকা। মফিজ মিয়াকে সবাই অনুরোধ করে বললো যে, কিভাবে তারা অল্প টাকায় ঢাকায় যেতে পারবে। তখন মফিজ মিয়া বললো, বাসের ছাদে গেলে তারা অর্ধেক ভাড়ায় অর্থাৎ ৫০ টাকায় যেতে পারবে। অতঃপর সবাই রাজি হয়ে যায় এবং বাসের ছাদে চড়ে ঢাকায় আসে। তখন থেকে শুরু হয় অর্ধেক ভাড়ায় বাসের ছাদে চড়ে ঢাকায় যাওয়া। আর এভাবেই উত্তরবঙ্গের মানুষ দারিদ্র্যের কারণে অর্ধেক ভাড়ায় বাসের ছাদে চড়ে ঢাকায় আসার সুযোগ পায়। একসময় এটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।

রাস্তায় কন্ডাকটাররা ভাড়া কালেকশনের সময় হেল্পারদের ছাদে পাঠিয়ে বলে, দেখতো মফিজের কতোজন লোক আছে? মানে মফিজ কতোজনকে বাসের ছাদে উঠিয়ে দিয়েছে। আর এ কথাটাই এক সময় কন্ডাকটাররা হেল্পারকে বলতে শুরু করে যে, দেখতো ছাদে মফিজ কতোজন আছে। এরপর থেকেই যারা বাসের ছাদে চড়ে ঢাকায় আসে তাদেরকে মফিজ বলা হয়। উত্তরবঙ্গের লোক গরিব। অর্ধেক ভাড়া দিয়ে বাসের ছাদে চড়ে ঢাকা যাওয়া আসা করে। এই দারিদ্রতার কারনেই তাদেরকে মফিজ বলা হয়। যদিও বর্তমানে উত্তরবঙ্গের লোকদের অনেক উন্নতি হয়েছে তবুও সেই আগের নামটি রয়েই গেছে ঢাকা শহরে।

এই হচ্ছে ঘটনা। এলিট সমাজের উদ্দেশ্যে বলছি- মফিজরা গরীব হতে পারে, কিন্তু তাদের ভেতর কুটিলতা নেই। তারা কতটা সহজ-সরল সেটা আপনি যদি নিজের চোখে দেখেন তাহলে আপনার জীবনদর্শনই পাল্টে যাবে। নিজেকে একবার চিন্তা করুন তো সেই হতদরিদ্র মানুষগুলোর জায়গায়! কল্পনা করুন, বন্যায় আপনার বাড়ীঘর, আবাদী জমি, গবাদিপশু সব নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বন্যা শেষ হলো, নদীর বুকে জেগে উঠল চর। সেই চরে কষ্ট করে আবার শূণ্য থেকে সব শুরু করলেন। মাথার উপরের ছাদ নেই, খাবার নেই, পানি নেই! ছেলেপুলেরা ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস এই দুর্বিষহ অবস্থায় আপনি হলে কি করতেন? এই মফিজরা জন্ম থেকে মৃত্যু এই কষ্ট ভোগ করছে! প্রতিবছর বন্যা, শীতে তারা কতটা নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে সেটা আপনি এলিট কল্পনা করতে পারবেন না! আমার এক পরিচিত ভাই আছেন। যিনি পঞ্চগড়ের ঘোর গ্রাম থেকে নটরডেম, বুয়েট পেরিয়ে নাসায় খুব ভাল একটা পদে চাকরী করছেন। সেই হিসেবে আপনারা এলিট, আপনাদের তো নাসার ডিরেক্টর হয়ে যাওয়ার কথা!

যেই তিস্তা ব্যারেজের জন্য আপনার এত লাফালাফি, এত আন্দোলন, এত নিন্দা , সেই তিস্তা ব্যারেজের অভিশাপে সর্বস্ব হারানো সহজ-সরল মানুষেরা আপনাদের কাছে “মফিজ”! লজ্জা লাগে না আপনাদের? একটা কথা জেনে রাখুন, এই মফিজরা আছে বলেই এই দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। এই মফিজরা আছে বলেই আজ আপনারা “এলিট”! মফিজ বলে ডাকবেন সমস্যা নাই, কিন্তু বঞ্চনা করবেন না! মফিজরা সম্মান ডিজার্ভ করে, বঞ্চনা নয়!

‘এই গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোন সংবাদ বা তথ্য কপি/পেষ্ট করে প্রকাশ করা কপিরাইট আইনে অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।’